কবিতার ডায়রী



তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে-
উষ্ণ দেহ ছেনে ছেনে কুড়িয়েছি সুখ,
পরস্পর খুড়ে খুড়ে নিভৃতি খুঁজেছি।
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।
যেভাবে ঝিনুক খুলে মুক্ত খোঁজে লোকে
আমাকে খুলেই তুমি পেয়েছো অসুখ,
পেয়েছো কিনারাহীন আগুনের নদী।

শরীরের তীব্রতম গভীর উল্লাসে
তোমার চোখের ভাষা বিস্ময়ে পড়েছি-
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।
জীবনের প’রে রাখা বিশ্বাসের হাত
কখন শিথিল হয়ে ঝ’রে গেছে পাতা।
কখন হৃদয় ফেলে হৃদপিন্ড ছুঁয়ে
বোসে আছি উদাসীন আনন্দ মেলায়-
তোমাকে পারিনি ছুঁতে-আমার তোমাকে,
ক্ষাপাটে গ্রীবাজ যেন, নীল পটভূমি
তছ নছ কোরে গেছি শান্ত আকাশের।
অঝোর বৃষ্টিতে আমি ভিজিয়েছি হিয়া-
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।।
______ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

 >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
 **কেউ বলেনি তবু এলাম, বলতে এলাম ভালবাসি**
_________________________ হেলাল হাফিজ
 কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো।

কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না
রাত কাটে তো ভোর দেখি না
কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না কেউ জানেনা।

নষ্ট রাখীর কষ্ট নিয়ে অতটা পথ একলা এলাম
পেছন থেকে কেউ বলেনি করুণ পথিক
দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিও,
কেউ বলেনি ভাল থেকো সুখেই থেকো
যুগল চোখে জলের ভাষায় আসার সময় কেউ বলেনি
মাথার কসম আবার এসো।
জন্মাবধি ভেতর থেকে এক রঙিন পাখি কেঁদেই গেলো
শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক,
চৈত্রাগুনে জ্বলে গেলো আমার বুকের গেরস্স্থালি
বললো না কেউ তরুন তাপস এই নে চারু শীতল কলস।

লন্ডভন্ড হয়ে গেলাম তবু এলাম।

ক্যাঙ্গারু তার শাবক নিয়ে যেমন করে বিপদ পেরোয়
আমিও ঠিক তেমনি করে সভ্যতা আর শুভ্রতাকে বুকে নিয়েই
দুঃসময়ে এতটা পথ একলা এলাম শুশ্রূষাহীন।

কেউ বলেনি তবু এলাম, বলতে এলাম ভালবাসি।


>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

দেখা না হওয়ার যণ্ত্রণায়, তবু বলবো না, এসো
______তসলিমা নাসরিন
এই শহরেই তুমি বাস করবে, কাজে অকাজে দৌড়োবে এদিক ওদিক
কোথাও আড্ডা দেবে অবসরে, মদ খাবে, তুমুল হৈ চৈ করবে,
রাত ঘুমিয়ে যাবে, তুমি ঘুমোবে না।
ফাঁক পেলে কোনও কোনও সন্ধেয় এ বাড়ি ও বাড়ি খেতে যাবে, খেলতে যাবে,
কে জানে হয়তো খুলতেই যাবে আলগোছে কারও শাড়ি
আমার আঙিনা পেরিয়েই কোনও বাড়িতেই হয়তো।
এ পাড়াতেই হয়তো দু’বেলা হাঁটাহাঁটি করবে, হাতের নাগালেই থাকবে,
হয়তো কখনও জানিয়েও দেবে আমাকে, যে, কাছেই আছো,
কুঁকড়ে যেতে থাকবো, কুচি কুচি করে নিজেকে কাটতে থাকবো
দেখা না হওয়ার যণ্ত্রণায়, তবু বলবো না, এসো। বলবো না,
তোমাকে সুযোগ দেব না বলার যে তোমার সময় নেই, বা ভীষণ ব্যস্ত তুমি ইদানিং
তোমার অপ্রেম থেকে নিজেকে বাঁচাবো আমি।

তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না।বছর পেরোবে, তোমার সঙ্গে দেখা হবে না আমার,
দেখা না হতে না হতে ভুলতে থাকবো তোমার সঙ্গে দেখা হওয়াটা ঠিক কেমন ছিল
কী রঙের সার্ট পরতে তুমি, হাসলে তোমাকে ঠিক কেমন দেখাতো,
কথা বলার সময় নখ খুঁটতে, চোখের দিকে নাকি অন্য কোথাও তাকাতে,
পা নাড়তে, ঘন ঘন চেয়ার ছেড়ে উঠতে, জল খেতে কিনা, ভুলতে থাকবো।
দেখা না হতে না হতে ভুলতে থাকবো তুমি ঠিক দেখতে কেমন ছিলে,
তিলগুলো মুখের ঠিক কোথায় কোথায় ছিল, অথবা আদৌ ছিল কিনা।
তোমার চুমু খাওয়াগুলো ঠিক কেমন, জড়িয়ে পেঁচিয়ে চুলে বা বুকে মুখ গোঁজাগুলো ঠিক কেমন, ভুলতে থাকবো।
অনেকগুলো বছর পেরিয়ে যাবে, তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।
এক শহরেই, অথচ দেখা হবে না।
পথ ভুলেও কেউ কারও পথের দিকে হাঁটবো না,
আমাদের অসুখ বিসুখ হবে, দেখা হবে না।
কোনও রাস্তার মোড়ে কিংবা পেট্রোল পাম্পে কিংবা মাছের দোকানে, বইমেলায়, রেস্তোরাঁয়, কোথাও দেখা হবে না।
আরও অনেকগুলো বছর পর, ভেবে রেখেছি, যেদিন হুড়মুড় করে
এক ঝাঁক আলো নিয়ে সন্ধে ঢুকতে থাকবে আমার নির্জন ঘরে,
যেদিন বারান্দায় দাঁড়ালে আমার আঁচল উড়িয়ে নিতে থাকবে বুনো বৈশাখি
এক আকাশ চাঁদের সঙ্গে কথা বলবো যে রাতে সারারাত-
তোমাকে মনে মনে বলবোই সেদিন, কী এমন হয় দেখা না হলে,
দেখা না হলে মনে হতো বুঝি বেঁচে থাকা যায় না,
কে বলেছে যায় না, দেখ, দিব্যি যায়!
তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি কয়েক হাজার বছর,
তাই বলে কি আর বেঁচে ছিলাম না?
দিব্যি ছিলাম!
ভেবেছি বলবো,
তুমি তো আসলে একটা কিছুই-না ধরনের কিছু,
আমার আকাংখা দিয়ে এঁকেছিলাম তোমাকে,
আমার আকাংখা দিয়ে তোমাকে প্রেমিক করেছিলাম,
আমার আকাংখা দিয়ে তোমাকে অপ্রেমিকও করেছি
তোমাকে না দেখে লক্ষ বছরও বেঁচে থাকতে পারি!
অপ্রেমিককে না ছুঁয়ে, অনন্তকাল।
এক ফোঁটা চোখের জল বর্ষার জলের মতো ঝরে ধুয়ে দিতে পারে
এতকালের আঁকা সবগুলো ছবি, তোমার নাম ধাম দ্রুত মুছে দিতে পারে চোখের জল।
তোমাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।
আমাকে একা বলে ভেবো না কখনো, তোমার অপ্রেম আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকে।

   >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
****হিসেব***
- তসলিমা নাসরিন
কতটুকু ভালবাসা দিলে,
ক' তোড়া গোলাপ দিলে,
কতটুকু সময়,কতটা সমুদ্র দিলে,
কটি নির্ঘুম রাত দিলে,ক ফোঁটা জল দিলে চোখের—
সব যেদিন ভীষন আবেগে শোনাচ্ছিলে আমাকে,
বোঝাতে চাইছিলে আমাকে খুব ভালোবাসো!

আমি বুঝে নিলাম—
তুমি আমাকে এখন আর 'একটু ও ভালোবাসো না।
ভালোবাসা ফুরোলেই মানুষ হিসেব কষতে বসে,
তুমিও বসেছো।
ভালোবাসা ততদিনই ভালোবাসা
যতদিন এটি অন্ধ থাকে,বধির থাকে,
যতদিন এটি বেহিসেবি থাকে...
  >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
"নাম দিয়েছি ভালোবাসা"
___ নির্মলেন্দু গুন
তোমাকে এমন হঠাৎ ভাবি কেন?
তোমাকে আমি জন্ম থেকে চিনি
বাংলা দেশের তুলনামূলক রূপে
যদি-বা তুমি দেখতে বিদেশিনী।

তোমাকে এমন হঠাৎ ভাবি কেন?
তুমি আমার বিভূঁই বিষ্ণুপ্রিয়া
অবাক করা চোখের চাহনিতে
তোমাকে আমি চিনেছি ওফেলিয়া।
তুমি আমার জীবন ভরে আসা
নদীর মতো মদিরে কল্লোল
চৈত্রে ফোটা কৃষ্ণচূড়ার ফুল,
তুমি কি তবু হঠাৎ ভালোবাসা?
তোমাকে এমন হঠাৎ ভাবি কেন............

 >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
কন্টক বাসর

– নির্মলেন্দু গুণ

 না হয় রক্ত হবে
মাধবীর সিঁথির সিঁদুর
তবুও সত্যের মত রোগী হয়ে
সচকিত স্বপ্নের রুটি
শুকরের মত ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাব
না হয় দুর্গম হলো
কন্টকীত ভোরের নীলিমা
তবুও মদাক্রান্ত পশুর মত
দুর্গম বালির ঝড়
মরুভূর উট হয়ে হেঁটে হেঁটে যাব।
এবং যাবই আমি
রক্তের খর নদী বেয়ে
আকাঙ্কিত মাধবীর প্রশুদ্ধ বাসরে
যখন ভ্রষ্টা নারী
মতান্তরে কাম্য হয়
সূর্ষরঙ কোন এক ভোরের আসরে।

 

 >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

আমি চলে যাচ্ছি 

– নির্মলেন্দু গুণ 

 

 জয় করবার মতো একটি মনও যখন আর অবশিষ্ট নেই,
তখন আমার আর বসে থেকে কী প্রয়োজন? আমি যাই।
তোমরা পানপাত্র হাতে হোয়াং হো রেস্তোঁরার নির্জনতায়
মৃদু আলোর নিচে বসে মৃদুলের গান শোনো, আমি যাই।
মহাদেব-নীলা-অসীম-অঞ্জনা-কবীর-বদরুন আমি যাই,
ইয়াহিয়া, আমি চললাম। এই-যে নাসরিন, আমি আসি।

যদি কোনোদিন এই রাত্রি ভোর হয়, যদি কখনো আবার
সূর্য ওঠে রূপসী বাংলায়, আবার কখনো যদি ফিরে পাই
আমার যৌবন, যদি পাই অনন্ত স্বপ্নের মতো নারী, কবি
না হয়ে, অন্য যা-কিছু হয়ে আমি ফিরে আসতেও পারি।

অভিভূত কবির মতন নারীকে আমি ভালোবেসেছিলাম।
সুচিত্রা সেনের মতো অপরূপা, বিদুষী-সুন্দরী ছিল তারা,
তাদের দেহে স্বর্গের লাবণ্য ছিল কিন্তু হৃদয় ছিল ঘাস।
আমার প্রেম নিয়ে তারা কত রকমের যে রহস্য করেছে-
গাধা ভেবে কেউবা নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দিয়েছে মুলো;
কেউবা উরাত দেখিয়ে-দেখিয়ে কাটিয়েছে কাল। তারপর
একদিন সর্পচর্মবৎ আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেছে
দূরে। আমি নিঃস্ব গৃহকোণে, তারা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে।
অথচ তাদের কথা ভেবে আমি কেঁদেছি নিদ্রায়-জাগরণে।
এখন আমারও হৃদয়ে আর প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই,
বাসনার আলোড়ন নেই, আজ আমারও হৃদয়ে শুধু ঘাস,
শুধু স্মৃতি, শুধু স্মৃতি, শুধু স্মৃতি আর স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস।

জয় করবার মতো একটি মনও যখন আর অবশিষ্ট নেই,
তখন আর আমার বসে থেকে কী প্রয়োজন? আমি আর
কতো ভালোবাসবো? আর কার জন্যে অপেক্ষা আমার?
তার চেয়ে এই কি যথার্থ নয়? আমি খুব দূরে চলে যাই।

যদি কোনোদিন এই রাত্রি ভোর হয়, আবার কখনো যদি
সূর্য ওঠে নিষ্ঠুর বাংলায়, আবার কখনও যদি ফিরে পাই
আমার যৌবন, যদি পাই আমার স্বপ্নের সেই নারী, কবি
না হয়ে, অন্য যা-কিছু হয়ে আমি ফিরে আসতেও পারি।

তোমরা পানপাত্র হাতে হোয়াং হো রেস্তোঁরার নির্জনতায়
মৃদু আলোর নিচে বসে মৃদুলের গান শোনো, আমি চলি।
মহাদেব-নীলা-অসীম-অঞ্জনা-কবীর-বদরুন, আমি যাই,
ইয়াহিয়া, আমি চললাম। এই-যে নাসরিন, আমি আসি।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>



“তুমি তো কাঁদো না"
__সুভাষ মুখোপাধ্যায়

কী আশ্চর্য
কখনই তুমি তো কাঁদো না

পুঁটুলি পাকিয়ে রেখে গেছ
এ-বাড়ির আনাচে-কানাচে
যে মনোবেদনা

পুড়ে যাচ্ছি আমি তার আঁচে

এ একরকম ভালো
শুনতে পাই না কানে
কে কী বলল, কে কেন চাইছে বেশি আরও
থাকতে হয় না সাতে পাঁচে কারও

গলিতে তোমার ছোট্ট এক চিলতে বাগানে
লঙ্কাগাছে ফুল ধরেছে সবে

তুমি আসছ কবে

ছেঁড়া সেলাইয়ের ছুঁচে,
ভাঙা জোড়া দেয়ার আঠায়
তুমি আছো
ছুঁলেই টের পাই

লাঠি হাতে উঠে
এ-ঘর ও-ঘর করি খোঁড়াতে খোঁড়াতে

কখনও সাক্ষাতে
বলি নি লজ্জার মাথা খেয়ে মুখ ফুটে

তবু খুব জানতে ইচ্ছা করে

কখনও না-কেঁদে
সমস্ত বর্ষার জল কেন তুমি হাসিমুখে
তুলে নাও দু-চোখের কোলে—

একদিন বাঁধ ভেঙে দিয়ে
আমাকে ভাসিয়ে দেবে ব’লে ?


  >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>


 সন্ধ্যায় তুমি আসবে বলে
একটি সম্পূর্ণ বিকেলকে আমি
কাঠের সিঁড়িতে দাঁড়
করিয়ে রেখেছিলাম।।

রাত্রে তোমার সময় হবে জেনে
একটি দিনকে তাড়াহুড়োর ছুঁতোয়
ক্ষুদ্র সম্ভাষণে বিদায় দিয়েছিলাম।।

ভোরে তুমি পদ্মিনী শুভ্রতা হবে বলে
আমি রাত্রির সমস্ত বাতিগুলো
স্বহস্তেই নিভিয়ে দিয়েছিলাম।।

এবং দুপুরে তুমি শঙ্খিনী হবে স্থিরতায়
টেলিফোন, ঘুঘু ও কাককে
আমার চৌহদ্দিতে আসতে বারণ করেছিলাম।।

এবং সায়াহ্নে তুমি আসবে প্রত্যয়ে
আমি দিবানিদ্রাকে রাত্রির অন্ধকারে
একটি দিনের জন্য ছুটি দিয়েছিলাম।।

___সানাউল হক


  >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

 ঘুম ভাঙার পর যেন আমার মন ভালো হয়ে যায়।
হলুদ-তেল মাখা একটি সকাল,
ঝর্নার জলে বৃষ্টিপাতের মতন শব্দ
ঝুল বারান্দার সামনের বাগানে কেউ হাসছে
শীতের রোদ্দুরের মতন।

কিছু ভাঙছে, কিছু খসে যাচ্ছে
বইয়ের পাতায় কার আঙুল, এখুনি যাবে অন্য পাতায়।
দিগন্ত থেকে ভেসে আসছে বিসর্জনের সুর
ঘুম ভাঙার পর যেন আমার মন ভালো হয়ে যায়।

(ঘুম ভাঙার পর
___সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)


 >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>


প্রেম
___তসলিমা নাসরিন

যদি আমাকে কাজল পড়তে হয় তোমার জন্য ,
চুলে মুখে রং মাখতে হয়,
গায়ে সুগন্ধী ছিটোতে হয়,
সবচেয়ে ভালো শাড়িটা যদি পড়তে হয়,
শুধু তুমি দেখবে বলে মালাটা চুড়িটা পড়ে সাজতে হয়,
যদি তলপেটের মেদ,
যদি গলার বা চোখের কিনারের ভাঁজ কায়দা করে লুকোতে হয়,
তবে তোমার সঙ্গে অন্য কিছু, প্রেম নয় আমার।

প্রেম হলে আমার যা কিছু এলোমেলো,
যা কিছু খুঁত,যা কিছুই ভুলভাল অসুন্দর থাক, সামনে দাঁড়াবো,
তুমি ভালবাসবে।
কে বলেছে প্রেম খুব সহজ, চাইলেই হয়!
এত যে পুরুষ চারিদিকে, কই, প্রেমিক তো দেখি না!


>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

মেঘ বৃষ্টি রোদ্দুর
_____ রুদ্র গোস্বামী
কোথায় যাচ্ছ ?
- মেঘের মাঠে ।
কেন ?
- জিজ্ঞেস করতে ।...
কি ?
- এতো কষ্ট নিয়ে,
মেঘ কার কাছে যায় !
যদি না বলে ?
- ফিরবো না ।
তোমার তো খুব জেদ !
- উঁহু, ভালবাসা ।

মেঘের মাঠে মেঘ যে নেই ।
- একটু আগে এই যে ছিল !
হয়তো ছিল,
বৃষ্টি যে তার গা ধুইয়েছে ।
এখন সে নেই ।
- কোথায় গেছে ?
রঙধনুটা যেখানে তার ঘর বেঁধেছে ?
ওই সেখানে ।
- তাহলে যাই ঝর্ণা-বাড়ি ।
কেন ?
- জিজ্ঞেস করতে ।
কি ?
- মেয়ের কেন ঘুম আসে না,
কান্না নিয়ে জেগেই থাকে,জেগেই থাকে !
যদি না বলে ?
- দাঁড়িয়ে থাকবো পাথর যেমন,
তোমার ভারী জেদ ।
উঁহু, ভালবাসা ।
ঝর্ণা-বাড়ি ঝর্ণা যে নেই ।
- এই যে তাকে দেখেছিলাম ,
শব্দ করে কাঁদছিল ?
হয়তো ছিল, এখন সে নেই ।
সূর্য তাকে নিয়ে গেছে পথ দেখিয়ে ।
- কোথায় গেছে ?
যেখানে তার পাহাড় প্রেমিক আকাশ হোলো,
ওই সেখানে।
- তুমি তো বেশ বলতে জানো,কাব্যি পড়ো ?
উঁহু, ভালবাসি ।
- কি যেন নাম ?
ক’দিন আগে পাহাড় ছিল, এখন আকাশ ।।
  >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

 "তুমি ফিরবে"
___সমরেশ মজুমদার
তুমি ফিরবে কোন একদিন
হয়তো নীলিমায় হারানো কোন এক
নিষ্প্রভ
বেলায়। নতুবা কোন এক নবীন হেমন্তে,
এক নতুন দিনের নির্মল খোলা হাওয়ায়।
অথবা কোন এক শ্রাবণের দিনে
অহরহ ঝরা ঘন কাল মেঘ বৃষ্টির
মুহু মুহু নির্ঝর খেলায়।
তুমি ফিরবে কোন এক রাতে
পূর্ণিমার ভরা জোছনায়।
তুমি ফিরবে জানি বহুদিন পরে
হয়তো বা হাজার বছর পরে।
কোন এক নিঃস্ব হৃদয়ে,
লক্ষ্য প্রাণের ভিড়ে, তুমি ফিরবে।
বহুরুপে সেই প্রাণে, অনেক নবীনের ভিড়ে,
তোমার আমার গড়া ভালবাসার নীড়ে!




   >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

ভালোবাসি, ভালোবাসি
_________সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ধরো কাল তোমার পরীক্ষা
রাত জেগে পড়ার
টেবিলে বসে আছ,
ঘুম আসছে না তোমার।
হঠাত করে ভয়ার্ত
কন্ঠে উঠে আমি বললাম-
ভালোবাস?
তুমি কি রাগ করবে?
নাকি উঠে এসে জড়িয়ে ধরে বলবে,
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো ক্লান্ত তুমি,
অফিসথেকে সবে ফিরেছ।
ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত পীড়িত..
খাওয়ার টেবিলে কিছুই তৈরি নেই,
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ঘর্মাক্ত
আমি তোমার
হাত ধরে যদি বলি- ভালোবাস?
তুমি কি বিরক্ত হবে?
নাকি আমার হাতে আরেকটু
চাপ দিয়ে বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো দুজনে শুয়ে আছি পাশাপাশি,
সবেমাত্র ঘুমিয়েছ তুমি
দুঃস্বপ্ন দেখে আমি জেগে উঠলাম।
শশব্যস্ত হয়ে তোমাকে ডাক
দিয়ে যদি বলি-
ভালোবাস?
তুমি কি পাশ ফিরে শুয়ে থাকবে?
নাকি হেসে উঠে বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি দুজনে।
মাথার উপর তপ্ত রোদ,বাহন
পাওয়া যাচ্ছেনা এমন সময় হঠাত
দাঁড়িয়ে পথ রোধ করে যদি বলি-
ভালোবাস?
তুমি কি হাত সরিয়ে দেবে?
নাকি রাস্তার সবার
দিকে তাকিয়ে কাঁধে হাত
দিয়ে বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো শেভ করছ তুমি,
গাল কেটে রক্ত
পড়ছে,এমন সময়
তোমার এক ফোঁটা রক্ত
হাতে নিয়ে যদি বলি-ভালোবাস?
তুমি কি বকা দেবে?
নাকি জড়িয়ে তোমার গালের রক্ত
আমার
গালে লাগিয়ে দিয়ে খুশিয়াল
গলায় বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো খুব অসুস্থ তুমি,জ্বরে কপাল
পুড়েযায়।
মুখে নেই রুচি, নেই কথা বলার
অনুভুতি,এমন সময় মাথায়
পানি দিতে দিতে তোমার মুখের
দিকে তাকিয়ে যদি বলি-ভালোবাস?
তুমি কি চুপ করে থাকবে?
নাকি তোমার গরম
শ্বাস আমার
শ্বাসে বইয়ে দিয়ে বলবে ভালোবাসি,ভালোবা
সি..
ধরো যুদ্ধের
দামামা বাজছে ঘরে ঘরে,
প্রচন্ড
যুদ্ধে তুমিও অঃশীদার,
শত্রুবাহিনী ঘিরে ফেলেছে ঘর।
এমন সময়
পাশে বসে পাগলিনী আমি তোমায়
জিজ্ঞেস করলাম-
ভালোবাস?
ক্রুদ্ধস্বরে তুমি কি বলবে যাও?
নাকি চিন্তিত আমায় আশ্বাস
দেবে,বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো দূরে কোথাও যাচ্ছ
তুমি,দেরি হয়ে যাচ্ছে,বেরুতে যাবে,হঠাত
বাধা দিয়ে বললাম-ভালোবাস?
কটাক্ষ করবে?
নাকি সুটকেস ফেলে চুলে হাত
বুলাতে বুলাতে বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি
ধরো প্রচন্ড
ঝড়,উড়ে গেছে ঘরবাড়ি,আশ্রয় নেই
বিধাতার দান এই
পৃথিবীতে,বাস করছি ।
দুজনে চিন্তিত
তুমি
এমন সময় তোমার
বুকে মাথা রেখে যদি বলি ভালোবাস?
তুমি কি সরিয়ে দেবে?
নাকি আমার মাথায় হাত রেখে বলবে
ভালোবাসি, ভালোবাসি..
ধরো সব ছেড়ে চলে গেছ কত দুরে,
আড়াই হাত মাটির নিচে শুয়ে আছ
হতভম্ব আমি যদি চিতকার
করে বলি-ভালোবাস?
চুপ করে থাকবে?
নাকি সেখান থেকেই
আমাকে বলবে ভালোবাসি, ভালোবাসি..
যেখানেই যাও,যেভাবেই
থাক,না থাকলেও দূর
থেকে ধ্বনি তুলো
ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি..
দূর থেকে শুনব তোমার
কন্ঠস্বর,বুঝব
তুমি আছ,তুমি আছ
ভালোবাসি, ভালোবাসি...........



  >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>



কেউ কথা রাখেনি
– সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
তারপর কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা চলে গেলো, কিন্তু সেই বোষ্টুমী
আর এলোনা
পঁচিশ বছর প্রতিক্ষায় আছি।

মামা বাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর
খেলা করে!
নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ
ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায়
তিন প্রহরের বিল দেখাবে?
একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি
ভিতরে রাস-উৎসব
অবিরল রঙের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা
কত রকম আমোদে হেসেছে
আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি!
বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন, আমরাও…
বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই
সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস-উৎসব
আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবেনা!
বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এ-রকম আতরের গন্ধ হবে!
ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দূরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীল পদ্ম
তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যে-কোনো নারী।
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!


 >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

 চাঁদটি লুকিয়েছে আড়ালে বনের,
কষ্টগুলো বেড়িয়ে এসেছে মনের।
একাকী এই নির্জন ক্ষণে,
তোমায় স্মরি সঙ্গোপনে।
ফেলে আসা দিন ফিরবে না আর,
সুযোগ হবে না চুলের সুবাস নেবার।
এক নিমিষের ঝড় হাওয়ায় সবই হল শেষ,
মনে মুছে যায়নি ভালবাসার রেশ।
জেগে থাকি তোমার জন্য ওগো প্রিয়তমা,
তুমি ছিলে আমার আকাশে চাঁদের উপমা।



.................জহির হাসান



>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

 "তুমি ডাক দিলে "
____হেলাল হাফিজ

একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতোটা কাঙাল,
কতো হুলুস্থুল অনটন আজন্ম ভেতরে আমার |

তুমি ডাক দিলে
নষ্ট কষ্ট সব নিমেষেই ঝেড়ে মুছে
শব্দের অধিক দ্রুত গতিতে পৌছুবো
পরিণত প্রণয়ের উৎসমূল ছোঁব
পথে এতোটুকু দেরিও করবো না

তুমি ডাক দিলে
সীমাহীন খাঁ খাঁ নিয়ে মরুদ্যান হবো,
তুমি রাজি হলে
যুগল আহলাদে এক মনোরম আশ্রম বানাবো |

একবার আমন্ত্রণ পেলে
সব কিছু ফেলে
তোমার উদ্দেশ্যে দেব উজাড় উড়াল,
অভয়ারণ্য হবে কথা দিলে
লোকালয়ে থাকবো না আর
আমরণ পাখি হয়ে যাব, – খাবো মৌনতা তোমার।




>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

 "কথোপকথন-১"
___পূর্ণেন্দু পত্রী

- কি করছো?
– ছবি আকঁছি।
- ওটা তো একটা বিন্দু।
– তুমি ছুঁয়ে দিলেই বৃত্ত হবে। কেন্দ্র হবে তুমি। আর আমি হবো বৃত্তাবর্ত।
- কিন্তু আমি যে বৃত্তে আবদ্ধ হতে চাই না। আমি চাই অসীমের অধিকার।
– একটু অপেক্ষা করো। . . . এবার দেখো।
- ওটা কি? ওটা তো মেঘ।
– তুমি ছুঁয়ে দিলেই আকাশ হবে। তুমি হবে নি:সীম দিগন্ত। আর আমি হবো দিগন্তরেখা।
- কিন্তু সে তো অন্ধকার হলেই মিলিয়ে যাবে। আমি চিরন্তন হতে চাই।
– আচ্ছা, এবার দেখো।
- একি! এ তো জল।
– তুমি ছুঁয়ে দিলেই সাগর হবে। তিনভাগ জলের তুমি হবে জলকন্যা। আর আমি হবো জলাধার।
- আমার যে খন্ডিতে বিশ্বাস নেই। আমার দাবী সমগ্রের।
– একটু অপেক্ষা করো। এবার চোখ খোল।
- ওটা কি আঁকলে? ওটা তো একটা হৃদয়।
– হ্যাঁ, এটা হৃদয়। যেখানে তুমি আছো অসীম মমতায়, চিরন্তন ভালোবাসায়। এবার বলো আর কি চাই তোমার?
- সারাজীবন শুধু ওখানেই থাকতে চাই।



>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>


"যদি তুমি ফিরে না আসো"
___শামসুর রাহমান
তুমি আমাকে ভুলে যাবে, আমি ভাবতেই পারি না।
আমাকে মন থেকে মুছে ফেলে
তুমি
আছো এই সংসারে, হাঁটছো বারান্দায়, মুখ দেখছো
আয়নায়, আঙুলে জড়াচ্ছো চুল, দেখছো
তোমার সিঁথি দিয়ে বেরিয়ে গেছে অন্তুহীন উদ্যানের পথ, দেখছো
তোমার হাতের তালুতে ঝলমল করছে রূপালি শহর,
আমাকে মন থেকে মুছে ফেলে
তুমি অস্তিত্বের ভূভাগে ফোটাচ্ছো ফুল
আমি ভাবতেই পারি না।

যখনই ভাবি, হঠাৎ কোনো একদিন তুমি
আমাকে ভুলে যেতে পারো,
যেমন ভুলে গেছো অনেকদিন আগে পড়া
কোনো উপন্যাস, তখন ভয়
কালো কামিজ প’রে হাজির হয় আমার সামনে,
পায়চারি করে ঘন ঘন মগজের মেঝেতে,
তখন
একটা বুনো ঘোড়া খুরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে আমাকে,
আর আমার আর্তনাদ ঘুরপাক খেতে খেতে
অবসন্ন হয়ে নিশ্চুপ এক সময়, যেমন
ভ্রষ্ট পথিকের চিৎকার হারিয়ে যায় বিশাল মরুভূমিতে।
বিদায় বেলায় সাঝটাঝ আমি মানি না
আমি চাই ফিরে এসো তুমি
স্মৃতি বিস্মৃতির প্রান্তর পেরিয়ে
শাড়ীর ঢেউ তুলে,সব অশ্লীল চিৎকার
সব বর্বর বচসা স্তব্দ করে
ফিরে এসো তুমি, ফিরে এসো
স্বপ্নের মতো চিলেকোঠায়
মিশে যাও স্পন্দনে আমার।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>


 "যদি ভালবাসা পাই"
-রফিক আজাদ

যদি ভালবাসা পাই আবার শুধরে নেব
জীবনের ভুলগুলি...
যদি ভালবাসা পাই ব্যাপক দীর্ঘপথে
তুলে নেব ঝোলাঝুলি ।
যদি ভালবাসা পাই শীতের রাতের শেষে
মখমল দিন পাব...
যদি ভালবাসা পাই পাহাড় ডিঙ্গাবো
আর সমুদ্র সাঁতরাবো ।
যদি ভালবাসা পাই আমার আকাশ হবে
দ্রুত শরতের নীল...
যদি ভালবাসা পাই জীবনে আমিও পাব
মধ্য অন্ত্যমিল ।



>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>



♦ .... মেহেদী পাতা .... ♦
♠♠____♥ ♥___♠♠

অনন্ত, মেহিদি পাতা দেখেছনিশ্চয়?
উপরে সবুজ, ভেতরে রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত-
নিজেকে আজকাল বড় বেশি মেহেদি পাতার মতো,
মনে হয় কেন?
উপরে আমি অথচ ভিতরে কষ্টের যন্ত্রনার-
এমন সব বড় বড় গর্ত যে-
তার সামনে দাড়াতে নিজেরীভয় হয়, অনন্ত।
তুমি কেমন আছো?
বিরক্ত হচ্ছ না তো?
ভালোবাসা যে মানুষকে অসহায়ও করে তুলতে পারে-
সেদিন তোমায় দেখার আগ পর্যন্ত-
আমার জানা ছিলো না।
তোমার উদ্দাম ভালোবাসার দূতি-
জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে ফেলেছে আমার ভিতর-
আমার বাহির-
আমার হাতে গড়া আমার থিবী।
অনন্ত, যেই মিথিলা শুখী হবে বলে-
ভালোবাসার পূর্ণ চঁন্দ গিলে খেয়ে-
ভেজা মেঘের মতো উড়তে উড়তে চলে গেল,
আজ অন্য শূন্য, অনন্তকে আরো শূন্য করে দিয়ে-
 তার মুখে এসব কথা মানাযনা,




>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>


 *** ব্যর্থ*****

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যদি প্রেম দিল না প্রাণে
কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে এমন গানে গানে?
কেন তারার মালা গাঁথা,
কেন ফুলের শয়ন পাতা,
কেন দখিন হাওয়া গোপন কথা জানায় কানে কানে?।
যদি প্রেম দিলে না প্রাণে
কেন আকাশ তবে এমন চাওয়া চায় এ মুখের পানে?
তবে ক্ষণে ক্ষণে কেন
আমার হৃদয় পাগল হেন,
তরী সেই সাগরে ভাসায় যাহার কূল সে নাহি জানে?।




  >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

  ****  নবদম্পতির প্রেমালাপ****
-------------------- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 



    নবদম্পতির প্রেমালাপ
বর -কেন সখি কোণে কাদিছ বসিয়া ?
কনে-পুষি মেনিটিরে ফেলিয়া এসেছি ঘরে ।
বর - কী করিছ বসে কুঞ্জভবনে ?
কনে-খেতেছি বসিয়া টোপা কুল ।
বর -জগং ছানিয়া ,কি দিব আনিয়া জীবন করি ক্ষয় ?
    তোমা তরে সখি ,বল করিব কী?
কনে -আরো কুল পাড় গোটা ছয় ।
·        * * * * * * * * *
বর -বিরহের বেলা কেমনে কাটিবে ?
কনে - দেব পুতুলের বিয়ে !!



 >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>




 "আকাশ সিরিজ"
__নির্মলেন্দু গুণ


শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
ঐ আনন্দে কেটে যাবে সহস্র জীবন।

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
অহংকারে মুছে যাবে সকল দীনতা।

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
স্পর্শসুখে লিখা হবে অজস্র কবিতা।

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
শুধু একবার পেতে চাই অমৃত আস্বাদ।

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
অমরত্ব বন্দী হবে হাতের মুঠোয়।

শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
তারপর হব ইতিহাস।





   >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>




 “পাঁপড়ি খোলা”
__ কাজী নজরুল ইসলাম


রেশমি চুড়ির শিঞ্জিনীতে রিমঝিমিয়ে মরম-কথা
পথের মাঝে চমকে কে-গো থমকে যায় ঐ শরম-লতা ।
কাঁখ-চুমা তার কলসি-ঠোঁটে
উল্লাসে জল উলসি' ওঠে,
অঙ্গে নিলাজ পুলক ছোটে
বায় যেনো হায় নরম লতা ।
অচকিতে পথের মাঝে পথ-ভুলানো পরদেশী কে
হানলে দিঠি পিয়াস-জাগা পথবালা এই ঊর্বশীকে !
শূন্য তাহার কন্যা-হিয়া
ভরল বঁধুর বেদনা নিয়া,
জাগিয়ে গেল পরদেশিয়া
বিধুর বঁধুর মধুর ব্যথা ।


  >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>



 ‘‘চাঁদের ভিতর চাঁদ ভাঙে’’
_____রুদ্র গোস্বামী

আমি চাই একটা চাঁদ উঠুক।
আমার কষ্টে খুব কাঁদুক।
আমার সুখে সে আলো আলো হাসুক।
তার তিলের মতো কলঙ্ক থাকুক,
সোনার মতো রূপ থাকুক।
তাকে দেখে আমি ভাবি
সব থেকে সুন্দর দৃশ্যটি বুঝি এই ।
আমার তাকে দেখতে ভালো লাগুক।
তাকে ছুঁয়ে আমি বলি,
সে আমার ভীষণ রকম সুখ।

আমি চাই একটা চাঁদ উঠুক
তার জন্ম শুধু আমার জন্যে থাকুক।
তার মৃত্যু শুধু আমার জন্যে থাকুক ।
তাকে পেয়ে আমি বলি,
তার জন্যে আমি এর আগেও বহুবার জন্মেছিলাম।
তার জন্যে আমার অপেক্ষা ছিল,অশ্রু ছিল।
অজস্র চিঠিতে তাকে আমি ভালবাসি লিখেছিলাম।

আমি চাই একটা চাঁদ উঠুক
তার কথা শুধু আমার জন্যে থাকুক,
তার ব্যথা শুধু আমার জন্যে থাকুক।
এমন তো নয় মেয়ে বলে কেউ চাঁদ ভাববে না ।
এমন তো নয় মেয়ে বলে কারো রূপ খুজতে নেই ।





 >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>




 "আমি চিরতরে দূরে চলে যাব"
___কাজী নজরুল ইসলাম

আমি চির তরে দূরে চলে যাবো
তবু আমারে দিবোনা ভুলিতে,
আমি বাতাস হইয়া, জড়াইবো কেশ
বেনী যাবে যবে খুলিতে।

তোমার সুরের নেশায় যখন
ঝিমাবে আকাশ, কাঁদিবে পবন,
রোদন হইয়া আসিব তখন
তোমারো বক্ষে দুলিতে।

আসিবে তোমার পরম উৎসব
কত প্রিয়জন, কে জানে
মনে পড়ে যাবে কোন সেই ভিখারী
পাইনি ভিক্ষা এখানে।

তোমার কুঞ্জ পথে যেতে হায়
চমকে থামিয়া যাবে বেদনায়
দেখিব কে যেন মরে পড়ে আছে
তোমার পথের ধূলিতে।।..................




   >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>


 ‘‘বনলতা সেন’’
__জীবনানন্দ দাশ

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয়-সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরেরবনলতা সেন ।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, 'এতদিন কোথায় ছিলেন?'
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে - সব নদী - ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।


  >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>


*** কি অদ্ভুত তুমি***

কি অদ্ভুত তুমি !
ব্যথা দিয়ে বল, ব্যথা পেয়েছ ?
কাঁদিয়ে বল, কাঁদছও কেন?
...
...হাঁসিয়ে বল, হাঁসছ কেন?
আমি কিছুই বলি না,
শুধু তোমার চোখে চোখ রেখে, বলি –
ও কিছু না ।
কি উন্মাদ তুমি !
কাছে টেনে বল, কাছে এসো না,
প্রশ্ন করে বল, কথা বলবে না,
হাঁসতে হাঁসতে বল, কি বিশ্রী তুমি,
পাশে বসে বল, দূরে যাও না,
হাত ছুঁয়ে বল, এসব
কি?

আমি কিছুই বলি না,
শুধু তোমার চোখে চোখ রেখে,
বলি – ও কিছু না ।
কি উন্মনা তুমি !
হাতে ঘড়ি নিয়ে বল, কয়টা বাজে?
ফুলে নাক শুঁকে বল, ফুল ভাল না,
কাঁধে কাঁধ রেখে বল, তুমি ভাল না,
ঘুম ঘুম চোখে বল, ঘুম আসে না ।
নির্বাক আমি,
কিছুই বলি না,
শুধু শুধু তোমার চোখে চোখ রেখে,
ফিসফিস
করে শিশিরের শব্দের মত-
বলি - ভালোবাসি !




 >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>


*** বিষন্নতা নয় সত্যিই ভালবাসি***

আজ শ্যাওলা ঘেরা
রোদে পোড়া এই দেয়ালে
তোমার প্রতিচ্ছবি!
আজ বৃষ্টি ঘেরা,
মেঘের মেলায় জানো আমার
মেরু আজ শীতল মরুভূমি।

আজ পুরনো সে কবিতায়
আজ কেন তুমি মূর্ছনায়,
কেন আকছ আমায়?
আমার হাতে শিকল
ভালবাসার তরী আজ বিকল
তবুও ভালবাসি আমি অটল,অবিচল। আজ আমার চোখ শিশির,
আমার কান্না আজ বৃষ্টির
তবু অপেক্ষায় সেই দৃষ্টির। তোমার আগ্নেয়গিরি অনল পুড়িয়েছে আমার সর্বস্য, বিষন্নতা নয় সত্যিই ভালবাসি,ভালবাসি তোমায় আর
তোমার হৃদয় দিঘীর এ রহস্য।




 >>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

 ****ব্যর্থ প্রেম ***

- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

প্রতিটি ব্যর্থ প্রেমই আমাকে নতুন অহঙ্কার দেয়
আমি মানুষ হিসেবে একটু লম্বা হয়ে উঠি
দুঃখ আমার মাথার চুল থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত
ছড়িয়ে যায়
আমি সমস্ত মানুষের থেকে আলাদা হয়ে এক
অচেনা রাস্তা দিয়ে ধীরে পায়ে
হেঁটে যাই
সার্থক মানুষদের আরো-চাই মুখ আমার সহ্য হয় না
আমি পথের কুকুরকে বিস্কুট কিনে দিই
রিক্সাওয়ালাকে দিই সিগারেট
অন্ধ মানুষের শাদা লাঠি আমার পায়ের কাছে
খসে পড়ে
আমার দু‘হাত ভর্তি অঢেল দয়া, আমাকে কেউ
ফিরিয়ে দিয়েছে বলে গোটা দুনিয়াটাকে
মনে হয় খুব আপন
আমি বাড়ি থেকে বেরুই নতুন কাচা
প্যান্ট শার্ট পরে
আমার সদ্য দাড়ি কামানো নরম মুখখানিকে
আমি নিজেই আদর করি
খুব গোপনে
আমি একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ
আমার সর্বাঙ্গে কোথাও
একটুও ময়লা নেই
অহঙ্কারের প্রতিভা জ্যোতির্বলয় হয়ে থাকে আমার
মাথার পেছনে
আর কেউ দেখুক বা না দেখুক
আমি ঠিক টের পাই
অভিমান আমার ওষ্ঠে এনে দেয় স্মিত হাস্য
আমি এমনভাবে পা ফেলি যেন মাটির বুকেও
আঘাত না লাগে
আমার তো কাউকে দুঃখ দেবার কথা না


>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>


***ভালোবাসার সংজ্ঞা****

ভালোবাসা মানে দুজনের পাগলামি,
পরস্পরকে হৃদয়ের কাছে টানা;
ভালোবাসা মানে জীবনের ঝুঁকি নেয়া,
বিরহ-বালুতে খালিপায়ে হাঁটাহাঁটি;

ভালোবাসা মানে একে অপরের প্রতি
খুব করে ঝুঁকে থাকা;
ভালোবাসা মানে ব্যাপক বৃষ্টি, বৃষ্টির একটানা
ভিতরে-বাহিরে দুজনের হেঁটে যাওয়া;
ভালোবাসা মানে ঠাণ্ডা কফির পেয়ালা সামনে
অবিরল কথা বলা;
ভালোবাসা মানে শেষ হয়ে-যাওয়া কথার পরেও
মুখোমুখি বসে থাকা।

0 comments:

Post a Comment